5:30 am - Friday January 19, 2018

কাগজপত্রহীন ১১ মিলিয়ন অবৈধ অভিবাসী বৈধ হচ্ছে?

কাগজপত্রহীন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত প্রায় ১১ মিলিয়ন অভিবাসীকে বৈধতা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এই সম্ভাবনার কথা লিখেছে নিউইয়র্ক টাইমস। ৯ জানুয়ারি অভিবাসন সংস্কার নিয়ে যে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হয়েছে, সেখানে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এমন ইঙ্গিত দিয়েছেন।

ওই বৈঠকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও তাঁর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং ডেমোক্র্যাটসহ ২৬ জন সিনেটর উপস্থিত ছিলেন। সেখানে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অভিবাসন ও নাগরিকত্ব প্রশ্নে তাঁর আগের কঠোর অবস্থান থেকে সরে আসার কথা জানান। বলেন, ‘ঠিক আছে, আপনারা যদি আমার দিকে সব আগুনের গোলা ঠেলে দিতে চান, আমিও সেই আগুন নিয়ে খেলতে প্রস্তুত, আমি পরোয়া করি না।’ তবে সীমান্তে নিরাপত্তা ও দেয়াল নির্মাণে অর্থছাড়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে দুই দলকেই।

অবৈধ ব্যক্তিদের নাগরিকত্ব দেওয়ার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম। তিনি বলেন, ১১ মিলিয়ন মানুষকে নাগরিকত্ব দেওয়ার বিধান প্রণয়ন করে এর একটা ইতি টানলে সেটা মানবিক হতে পারে। সেটা প্রথমবার আমলে নিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। বলেছেন, ‘ডাকা প্রকল্পের একটা সুষ্ঠু সমাধানের পর আপনারা সবাই মিলে যদি আমার দিকে ‘হিট’ ঠেলে দেন, আমিও সেটা নিতে জানি।’

অবশ্য, ওয়াশিংটন পোস্ট লিখেছে, এমন অনেক কথাই বলেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প, কিন্তু পরক্ষণেই আবার নিজেই সেটা পাল্টিয়ে তাঁর আগের অবস্থানে কথাও বলতে শোনা গেছে তাঁকে। গণমাধ্যমের সামনে অনুষ্ঠিত বৈঠকের পরে আলাদা যে রুদ্ধদার বৈঠক হয়েছে, সেই মিটিংয়ে খোলাসা করে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কিছু বলেছেন কি না, সেটা জানতে চাইলে ডেমোক্র্যাট-দলীয় একজন সিনেটর বলেছেন, ‘অভিবাসন প্রশ্নে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এমন অনেক প্রস্তাব দিয়েছেন, যাতে আমার মাথা এখনো ঘুরছে। একজন মানুষ এমন ৩৬০ ডিগ্রি নিজেকে পরিবর্তন করার কথা বলতে পারেন কীভাবে। সে কারণেই সংবাদমাধ্যমে এখন জোর আলোচনা, ডোনাল্ড ট্রাম্প কি আসলেই ঝুলে থাকা ১১ মিলিয়ন বা ১ কোটি ১০ লাখের বেশি মানুষের জন্য নাগরিকত্বের পথ উন্মুক্ত করতে পারেন?

এই সম্ভাবনার কথাটি আসছে। কেননা, এর আগে সত্তর আর নব্বইয়ের দশকে এমন অভিবাসীবান্ধব নাগরিকত্ব আইন হয়েছিল এবং দুটোই রিপাবলিকান শাসন আমলে। ১৭৮৭ সালে প্রণীত প্রথম উদার নাগরিকত্বের সুযোগ সৃষ্টি করা হয় সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে। সেটার পরিপ্রেক্ষিতে ১৭৯০ সালে নাগরিকত্বের নতুন বিধান করা হয়। যেখানে নিয়ম করা হয়, আইন মানা ও সচ্চরিত্রের শ্বেতাঙ্গরা, যাঁরা দুই বছরের অধিক সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন এবং ১ বছরের বেশি সময় ধরে একটি নিবাসে বসবাস করার রেকর্ড দেখাতে পারবেন, তাঁদের নাগরিকত্ব দেওয়া হবে। এরপরও যুক্তরাষ্ট্রে মানুষের স্রোত কখনোই বন্ধ হয়নি; বরং বেড়েছে দিনে দিনে।

যুক্তরাষ্ট্রে গণ-নাগরিকত্বের উদাহরণ
এরপর ১৭৯৫ সালে ওই আইনকে সংস্কার করা হয় এবং বিধান করা হয় যে নাগরিকত্ব পেতে হলে, ন্যূনতম ৫ বছরের বসবাসের রেকর্ড থাকতে হবে এবং তিন বছর আগেই সংশ্লিষ্ট দপ্তরে নাগরিকত্ব পাওয়ার ব্যাপারে ইচ্ছা পোষণ করে আবেদন জমা দিতে হবে। ওই একই আইনের সংস্কার হয় ১৭৯৮ সালে। তখন নাগরিকত্বের জন্য ১৪ বছরের বসবাস করার রেকর্ড দেখা হতো আর আবেদন করতে হতো ৫ বছর আগে। এই নিয়মগুলোই পরবর্তী সময়ে আধুনিকায়ন করা হয়।

কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্রেশন অ্যাক্ট বা অভিবাসন আইন হিসেবে যেটি এখনো বহাল আছে, সেটি মূলত ১৯৯০ সালের অধ্যাদেশ। এর মাধ্যমে একই সময়ে লাখ লাখ নাগরিকের বৈধ হওয়ার পথ উন্মুক্ত হয়। সিনেটর টেড কেনেডি ১৯৮৯ সালে এই বিল প্রস্তাব করেন, যা পাস হয় প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের আমলে। এটির অধীনে বছরে ৭ লাখ মানুষকে বৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব দেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করা হয়।

এই সময়ে এইচ ওয়ান ভিসা, কর্মক্ষেত্রের অনন্য ভিসা আর যাঁরা আছেন এই দেশে, তাঁদের পরিবারকে গ্রিন কার্ড দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে আনার সুযোগ সৃষ্টি হয়। আর রাজনৈতিক আশ্রয় বা কাগজপত্রহীন যেসব লাখ লাখ মানুষ এই দেশে এসে আর ফিরে যাননি, তাঁদের জন্য রিফিউজি ভিসা বা গ্রিন কার্ডের জন্য কিছু শিথিল নিয়মকানুন জারি করে বৈধ হওয়ার পথ উন্মুক্ত করা হয় প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের আমলে। সে সময় কেউ অন্য নাগরিকদের বিয়ে করার কাগজ দেখিয়ে অথবা অন্য প্রক্রিয়ায় গ্রিন কার্ড পাওয়ার সুযোগ পান। যাঁরা এর আগে দীর্ঘ সময় ধরে কাগজপত্রহীন ছিলেন অথবা অবৈধভাবে বসবাস করছিলেন, তাঁদের নাগরিকত্ব পাওয়ার পথ উন্মুক্ত হয়।

সেই প্রলোভনেই যুক্তরাষ্ট্রের নানা সীমান্ত দিয়ে হাজার হাজার মানুষ ঢুকে পড়েছিল পরবর্তী বছরগুলোতে। এমনকি প্রতিবছর শুধু মেক্সিকো সীমান্তে প্রায় আড়াই থেকে তিন লাখ মানুষ প্রবেশ করেন এখনো শরণার্থী হয়ে অথবা নিরাপত্তা প্রহরীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে। এই অবৈধ অনুপ্রবেশ অনেক খানিই বন্ধ হয়েছে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কড়াকড়িতে। তবে আগে যাঁরা এসেছেন এবং বহু বছর ধরে এই দেশে বসবাস করছেন, এমন ১ কোটি ১০ লাখ মানুষের ভাগ্যে কী হবে, সেটাই ছিল ২০১৬ সালে নির্বাচনী অ্যাজেন্ডা।

সেই নির্বাচনী প্রচারে অভিবাসন আইন সংস্কার আর সব অবৈধকে পর্যায়ক্রমে দেশে ফেরত পাঠানোর কড়া অবস্থান নিয়েছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। অন্যদিকে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী হিলারি ক্লিনটন অবৈধদের উন্মুক্ত নাগরিকত্ব দেওয়ার পক্ষে জোরালো অবস্থান নিয়েছিলেন। নির্বাচনে জয়ী হন ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু এখন তাঁর মুখে কিছুটা ভিন্ন সুর।

তবে অবৈধ ব্যক্তিদের নাগরিকত্ব দেওয়ার বিষয়ে এখনই পরিষ্কার করে কিছু বলেননি ডোনাল্ড ট্রাম্প। এখন তিনি গুরুত্ব দিচ্ছেন, প্রেসিডেন্ট ওবামার আমলে গৃহীত ডেফার্ড অ্যাকশন ফর চাইল্ড হুড অ্যারাইভাল—ডাকা প্রকল্পের ৬ লাখ ৯০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থীকে বৈধতা দেওয়ার আগে, কীভাবে মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল নির্মাণের টাকা পাওয়া যায়।

সে ক্ষেত্রে তিনি বলছেন, ডেমোক্র্যাটরা যদি চান এসব শিক্ষার্থী যাঁরা শিশুকালে তাঁদের বাবা-মায়ের হাত ধরে এই দেশে এসেছিলেন কাগজপত্রহীন হয়ে, তাঁদের নাগরিকত্ব দিতে হবে, তাহলে তাঁরা যেন সীমান্তে দেয়াল নির্মাণের বিষয়টি আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত করেন। এর সঙ্গে তিনি বলছেন, চেইন ইমিগ্রেশন বা পারিবারিক অভিবাসন আর ডিভি লটারি বন্ধের বিষয়েও সিদ্ধান্ত নিতে হবে।


Filed in: প্রবাস
error: Content is protected !!