4:12 pm - Monday February 19, 2018

অবশেষে জানা গেল বিএনপির আসল পরিকল্পনা

২০ দলীয় জোটের বাইরে সরকারবিরোধী দলগুলো নিয়ে যুগপৎ আন্দোলনের পরিকল্পনা করেছে বিএনপি। এক্ষেত্রে ডান, বাম ও মধ্যপন্থীদের যুক্ত করা হচ্ছে। তবে ২০ দলীয় জোটের ব্যানারে আন্দোলনে যেতে বেশ কয়েকটি দলের আপত্তি থাকায় তাদের নিয়ে আলাদাভাবে নতুন জোট গঠনের চিন্তাভাবনা হচ্ছে। ২০ দলীয় জোট ও নতুন জোট (প্রস্তাবিত) একই সঙ্গে সরকারবিরোধী সব আন্দোলনে যোগ দেবে।

এরই মধ্যে নতুন জোটের জন্য চারটি নাম প্রাথমিকভাবে প্রস্তাব করা হয়েছে। এগুলো হচ্ছে- ‘সর্বদলীয় ঐক্যজোট’, ‘সর্বদলীয় যুক্তফ্রন্ট’, ‘গণতান্ত্রিক অ্যালায়েন্স’ ও ‘পিপলস ফ্রন্ট’। এ চারটির মধ্য থেকে যে কোনো একটি নাম শিগগিরই চূড়ান্ত করা হবে। বিএনপির নীতিনির্ধারণী সূত্রে জানা গেছে এসব তথ্য।

এছাড়া আওয়ামী লীগ সরকারের টানা দুই মেয়াদের দুর্নীতির ফিরিস্তি নিয়ে মাঠে নামার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি। জিয়া অরফানেজ দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়ার সাজা হওয়ার পরদিন শুক্রবার গুলশানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে দলের যুগ্ম মহাসচিবদের এক বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। রোববার জোটের বৈঠকেও এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

বৈঠকে সরকারের দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করতে সংশ্লিষ্টদের দায়িত্ব দেয়া হয়। পাশাপাশি বলা হয়, এই দুর্নীতির ফিরিস্তি সংবলিত লিফলেট তৈরি করে তা সারা দেশে বিলি করার প্রস্তাব করা হয়। জোটের শরিক এক নেতা যুগান্তরকে জানান, বৈঠকে হলমার্ক, বেসিক ব্যাংক, বিসমিল্লাহ গ্রুপ, ফারমার্স ব্যাংক, এনআরবিসিসহ বিভিন্ন ব্যাংক ও শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির ঘটনা ওই লিফলেটে স্থান পাবে।

এছাড়া ‘ওয়ান ইলেভেন’ সরকারের সময় আওয়ামী লীগ সরকারের শীর্ষপর্যায় থেকে শুরু করে মন্ত্রী-এমপিসহ সব স্তরের নেতাদের বিরুদ্ধে যেসব মামলা হয়েছিল, সেগুলোর বিস্তারিত তথ্য থাকবে ওই লিফলেটে।

এ ব্যাপারে বিএনপির দায়িত্বপ্রাপ্ত এক নেতা যুগান্তরকে জানান, এরই মধ্যে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির তথ্য সংগ্রহ শেষ করেছেন তারা। সুনির্দিষ্ট তথ্য-উপাত্তসহ ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের দুর্নীতির ফিরিস্তি যে কোনো সময় লিফলেট আকারে দলের ৭৮টি সাংগঠনিক জেলায় পাঠিয়ে দেয়া হবে। একই সঙ্গে তা দলীয় নেতাকর্মীদের ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও তা প্রচারের আহ্বান জানানো হবে।

এদিকে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সাজা ও অন্যান্য মামলার বিষয়ে আজ আবারও বিদেশি কূনীতিকদের ব্রিফ করবে বিএনপি। বিকাল ৪টায় গুলশানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে ঢাকায় নিযুক্ত সব দেশের রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনার এবং বিদেশি সংস্থাগুলোর কূটনীতিকদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। বিএনপির কূটনৈতিক উইংয়ের এক সদস্য যুগান্তরকে জানান, খালেদা জিয়ার মামলা, সাজা এবং বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে ব্রিফ করবেন বিএনপি মহাসচিবসহ সিনিয়র নেতারা।

বিএনপির একজন শীর্ষ নীতিনির্ধারক সোমবার যুগান্তরকে বলেন, ২০ দলীয় জোটকে নিয়ে একই সঙ্গে এ যুগপৎ আন্দোলনে নামতে চায় দলটি। এক্ষেত্রে যেসব দল একতরফা নির্বাচন চায় না, আইনি শাসনে বিশ্বাস করে ও গণতন্ত্র চায়, তাদের প্রথমে জোটে আসার জন্য অনুরোধ করা হবে।

যদি কেউ ২০ দলীয় জোটে আসতে না চায়, সেক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দলকে প্রস্তাবিত নতুন জোটের ব্যানারে রেখে একই প্লাটফর্মের মাধ্যমে আন্দোলন সফল করার টার্গেট বিএনপির। রোববার জোটের বৈঠকেও সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করতে মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব দেন জোটের নেতারা।

এদিকে জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে এখনই আন্দোলনের একটি রূপরেখা দাঁড় করাতে চায় বিএনপি। দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি আন্দোলনের পাশাপাশি নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন যাতে হয়, তার ফয়সালাও চায় দলটি। এজন্য ২০ দলীয় জোটের বাইরে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে যারা কথা বলছেন এবং আন্দোলন করছেন, তাদেরও একই প্লাটফর্মে আনার উদ্যোগ নিয়েছেন তারা।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, এরই মধ্যে সরকারবিরোধী বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মতামতও নেয়া শুরু করেছে দলটি। এজন্য গোপনে সরকারের বাইরে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনাও চালানো হচ্ছে। দলগুলোর মধ্যে আছে বিকল্প ধারা বাংলাদেশ, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি), কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ ও নাগরিক ঐক্য- এ চারদলীয় জোট ‘যুক্তফ্রন্ট’, সিপিবি-বাসদসহ ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বর্জন করা ছোট-বড় আরও কয়েকটি দল।

শুধু রাজনৈতিক দলই নয়, দেশের বিশিষ্ট নাগরিকদের সঙ্গেও এ নিয়ে আলোচনা করবেন তারা। দলটির নেতারা জানান, একই প্লাটফর্মে এসে আন্দোলনের মাধ্যমে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়টিও ফয়সালা করার পাশাপশি নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে আগামী জাতীয় নির্বাচনের দাবিও তারা আদায় করবেন।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যুগান্তরকে বলেন, আগামী নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণে এবং নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে হলে জাতীয় ঐক্যের বিকল্প নেই। আর এ ঐক্য গড়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহজাহান যুগান্তরকে বলেন, যারা একতরফা নির্বাচন চান না, আইনের শাসনে বিশ্বাস করেন, গণতন্ত্র চান, তাদের জোটে আসার জন্য প্রথমে অনুরোধ করা হবে। কোনো দল যদি জোটে না আসতে চায়, তাহলে ‘সর্বদলীয় ঐক্যজোট’, ‘সর্বদলীয় যুক্তফ্রন্ট’, ‘গণতান্ত্রিক অ্যালায়েন্স’ ও পিপলস ফ্রন্ট- যে নামেরই হোক না কেন, তাদের নিয়ে যুগপৎ আন্দোলনে যাবেন তারা। আন্দোলনের উদ্দেশ্য নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন, একই সঙ্গে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি।

যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল যুগান্তরকে বলেন, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির মতো নির্বাচন যাতে না হতে পারে, সেজন্য সরকারের বাইরের ডান, বাম, মধ্যপন্থী- সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে একটি জোট গঠনের প্রক্রিয়া চলছে। নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকার প্রতিষ্ঠাই আমাদের প্রাথমিক লক্ষ্য। এজন্য দলের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা কাজ করছেন।

দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা চলছে। তবে কোন সমীকরণে তা চূড়ান্ত হবে, এ বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে কথা বলে ঠিক করবেন। এদিকে রোববারে ২০ দলীয় জোটের বৈঠকেও সরকারবিরোধী দলগুলোনকে একই প্লাটফর্মে আনার ব্যাপারে একমত হন জোটের নেতারা।

জোটের শরিক ন্যাশনাল পিপলস পার্টি-এনপিপির চেয়ারম্যান ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদ যুগান্তরকে বলেন, ভোটের অধিকার রক্ষায় আগামী দিনের আন্দোলনে সরকারবিরোধী সব রাজনৈতিক দলকে একমঞ্চে আনার পক্ষে সবাই একমত হয়েছে।

বৈঠকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মোবাইল ফোনে জোট নেতাদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য দেন। ওই সময় ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানও সরকারবিরোধী সব রাজনৈতিক দলকে নিয়ে পিপলস ফ্রন্ট গঠনের কথা বলেন। তিনি আরও বলেন, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য জোটগতভাবে আন্দোলন করার ব্যাপারে সবাই একমত হন।

এছাড়া বৈঠক সূত্রে জানা যায়, সরকারবিরোধী জনমত তৈরি করতে তৃণমূল সফরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হয় ২০ দলীয় জোটের বৈঠকে। শিগগিরই জোটের নেতারা বিভাগীয় শহরসহ সব জেলায় সফরে বের হবেন।


Filed in: রাজনীতি